নিজস্ব প্রতিবেদন:লক্ষ্মীপুরে সরকারি মহতী উদ্যোগ ‘কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ প্রকল্পে দুর্নীতির ঘুণপোকা ধরেছে। জেলার ৬২টি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত পুষ্টিকর খাবারের টাকা সুকৌশলে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। শুধু কোমলমতি কিশোর-কিশোরীদের মুখের গ্রাসই নয়, থাবা বসানো হয়েছে স্কুলের দপ্তরিদের নামমাত্র সম্মানীর ওপরেও। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব অনিয়মের ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কিশোর-কিশোরীদের গান, আবৃত্তি ও কারাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু সরেজমিনে লক্ষ্মীপুর সদর ও রায়পুর উপজেলার ১০টি কেন্দ্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। প্রকল্পের সেই মহৎ উদ্দেশ্য এখন ‘কাগজে-কলমে’ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ক্লাবে ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। প্রতি শুক্র ও শনিবার ক্লাসের দিন শিক্ষার্থীপ্রতি ৩০ টাকা করে ৯০০ টাকা নাশতার জন্য বরাদ্দ থাকে। ভ্যাট-ট্যাক্স বাদে ৭৫০ টাকা দিয়ে মানসম্মত নাশতা বিতরণের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
রায়পুর এলএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ৩০ জনের স্থলে মাত্র ৬ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত। তাদের পাতে দেওয়া হয়েছে ১০ টাকার এক প্যাকেট বিস্কুট, একটি সস্তা কেক ও নামমাত্র নুডলস। নাশতা সরবরাহকারী দোকানি সোজাসাপ্টা জানালেন, ‘সপ্তাহে এক দিন ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকার নাশতা সরবরাহ করি। বাকি দিন জেন্ডার প্রমোটররা ফলমূল কিনে আনেন।’ অথচ নথিপত্রে পুরো টাকার হিসাব দেখানো হচ্ছে।
একই চিত্র সোনাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও। সেখানকার সংগীত শিক্ষক হোসনে আরা বেগম অকপটে স্বীকার করেন, উপস্থিতি কম থাকলে নাশতার মান ও বাজেট কমিয়ে দেওয়া হয়। কোনোদিন ক্লাস বন্ধ থাকলে সেই টাকা কোথায় যায়, তার হদিস কেউ জানে না।
অনিয়মের জাল আরও বিস্তৃত হয়েছে দপ্তরিদের সম্মানী নিয়ে। বিদ্যালয় তদারকির জন্য দপ্তরিদের ৫০০ টাকা সম্মানী দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২০০ টাকা। বাকি ৩০০ টাকা কার পকেটে যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধূম্রজাল।
জেন্ডার প্রমোটরদের কথায় ফুটে উঠেছে এক ‘অদৃশ্য চাপ’-এর ইঙ্গিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন প্রমোটর জানান, উপর মহল থেকে নাশতার জন্য মাত্র ৫০০ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ কম পাওয়ায় তারা ভালো খাবার দিতে পারছেন না। তবে এই ‘অদৃশ্য হাত’টি কার, তা স্পষ্ট করেননি তারা।
প্রকল্পের সুপারভাইজার রাশেদ আলম অনিয়মের বিষয়টি অনেকটা দায়সারাভাবে স্বীকার করে বলেন, ‘ছয় মাস বন্ধ থাকার পর প্রকল্প চালু হয়েছে, কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে।’ তবে এই ‘এদিক-সেদিক’ যে বড় অঙ্কের লুটপাট, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
রায়পুর এলএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পলাশ কান্তি মজুমদারসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘শিক্ষকরা কখন আসেন, কখন যান এবং কী নাশতা দেন, তার কিছুই আমাদের জানানো হয় না। এটা যেন একটি গোপন কার্যক্রম।’
এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জোবেদা খানম পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলেন, ‘অফিস সহকারীর কাছ থেকে জেনে নিন।’ অথচ অফিস সহকারী দাবি করেছেন, ‘ম্যাডামই সব জানেন।’ এই লুকোচুরিতেই স্পষ্ট হয় দুর্নীতির গভীরতা।
লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এস এম মেহেদী হাসান এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘সরকারি প্রকল্পে কোনো ধরণের নয়ছয় বরদাশত করা হবে না। আমরা বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেব।’


















