নিজস্ব প্রতিবেদন : লক্ষ্মীপুর জেলাজুড়ে গত তিন মাস ধরে হামের প্রকোপ বাড়ছে। গত জানুয়ারি থেকে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলায় ২৪ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ইতিমধ্যে চারজনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হামের (মিজলস) জীবাণু পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই শিশু। এতে সাধারণ অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
বর্তমানে রায়পুর সরকারি হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন কেন্দ্রে সাতজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সর্বশেষ আজ আরও ২০টি নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বিছানায় কাতরাচ্ছে শিশু রাফি
রায়পুর সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, গত পাঁচদিন ধরে বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছে সাত বছরের শিশু মো. রাফি। তার পুরো শরীরে লালচে দানা ও প্রচণ্ড জ্বর। রাফি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম আলোনিয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে। তার মা সাহেলা বেগম একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী।
অভাবের সংসারে সন্তানের এই অসুস্থতায় দিশেহারা বাবা আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, “ছেলের অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়েছি। পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে আছি, ডাক্তাররা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন।” রাফি বর্তমানে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. কবির হোসেনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন।
যেখানে ছড়িয়েছে সংক্রমণ
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ২৪ জনের মধ্যে ৭ জন জেলা শহরের বাসিন্দা। বাকি ১৯ জন জেলার পাঁচটি উপজেলা—সদর, রায়পুর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতির বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। তবে লক্ষ্মীপুরের সীমান্তঘেঁষা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ এলাকার রোগীদেরও এই অঞ্চলে চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে।
যদিও গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাবে নতুন কোনো পজিটিভ রোগী শনাক্ত হয়নি, তবে ২০টি নমুনার ফল এখনো আসেনি। এই ফলগুলো হাতে এলে সংক্রমণের প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝা যাবে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত ১০০ শয্যার লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
কেন বাড়ছে সংক্রমণ?
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দুর্গম চরাঞ্চল এবং প্রান্তিক জনপদে টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই মূলত এই রোগের শিকার হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে সচেতনতার অভাব রয়েছে কিংবা যারা নিয়মিত টিকা কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত করতে পারেন না, তাদের শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। রাফির মতো অনেক শিশুই শৈশবে নিয়মিত টিকার ডোজ সম্পন্ন করেছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, “গত তিন মাসে ২৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জনের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য আমরা আজ আরও ২০টি নমুনা ল্যাবে পাঠিয়েছি।” তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। কোনো শিশুর শরীরে লালচে দানা, প্রচণ্ড জ্বর, কাশি কিংবা চোখ লাল হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার ও ভিটামিন-এ নিশ্চিত করা জরুরি।
লক্ষ্মীপুরের সচেতন মহল মনে করছেন, কেবল চিকিৎসা নয়, বরং টিকাদান কর্মসূচি থেকে কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে এখনই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। অন্যথায় এই প্রাদুর্ভাব বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

















