১১:৩৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

লক্ষ্মীপুরে গ্যাসের দামে ‘রক্তচোষা’ সিন্ডিকেট: লুটে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা

  • আপডেট: ০৪:৩২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
  • 22

নিজস্ব প্রতিবেদন : লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার এখন যেন এক ‘মগের মুল্লুক’। সরকার নির্ধারিত দাম ১৭২৮ টাকা হলেও, জেলাজুড়ে ভোক্তাদের থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৪০০ টাকা পর্যন্ত। বিইআরসি (এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের নাটক করলেও লক্ষ্মীপুরে তার কোনো ছিটেফোঁটাও কার্যকর নেই। কোম্পানিগুলোর ভাউচার জালিয়াতি আর ডিলারদের অতি মুনাফার লোভে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের রান্নাঘরে এখন হাহাকার।

বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “পত্রিকায় দেখি ১৭২৮ টাকা, দোকানে গেলে চায় ২৩০০ টাকা। দোকানিকে বললে সে ডিলারকে দোষ দেয়। আমরা কি চোর? নাকি আমাদের পকেট কাটার জন্য কোনো আইন নেই? প্রশাসন কি শুধু এসি রুমে বসে থাকার জন্য?”

শহরের এক গৃহিণী রাবেয়া খাতুন বলেন, “গ্যাসের দাম বাড়লে আমাদের চুলো বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। ৬০০-৭০০ টাকা বাড়তি দেওয়া মানে আমার বাচ্চার দুধের টাকা কেটে নেওয়া। সরকার দাম ঠিক করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে, কিন্তু বাজারে যে ডাকাতি হচ্ছে তা দেখার কেউ নেই।”

রিকশাচালক জয়নাল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ৫০০ টাকা কামাই করি। অথচ একটা গ্যাসের সিলিন্ডারে ৭০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এই দেশে গরিবের কোনো বিচার নাই, সব চোরের রাজত্ব!”

শীর্ষ সংবাদ এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে বড় বড় কোম্পানির ‘অদৃশ্য’ হাত। বসুন্ধরা গ্যাসের মতো কোম্পানিগুলোর ডিপো থেকে ডিলারদের কাছে ১৭৪৩ টাকা রাখা হলেও কাগজে-কলমে ভাউচার দেওয়া হচ্ছে ১৬৩৩ টাকার। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ১১০ টাকার কোনো হদিস নেই! এই ‘ব্ল্যাক মানি’ বা গোপন লেনদেনের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

ডিলাররা এই জালিয়াতির দায় স্বীকার করে বলছেন, “কোম্পানি আমাদের জিম্মি করে রেখেছে। তারা টাকা বেশি নিচ্ছে কিন্তু ভাউচার দিচ্ছে কম। এর ওপর ট্রান্সপোর্ট খরচ আর লেবার আছে। আমরা ২০০০ টাকার নিচে বিক্রি করলে আমাদের ফকির হতে হবে।”

এদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা বসুন্ধরা ও বেক্সিমকোর ডিলারদের কাছ থেকেই ২১০০ টাকা দরে গ্যাস কিনছেন। তাদের ভাষ্য— “আমরা যদি ২১০০ টাকায় কিনি, তবে ২৩০০-২৪০০ টাকায় বিক্রি না করলে আমাদের লাভ কই?” যদিও আজ ডিলাররা দাম কমানোর কথা বললেও খুচরা বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই।

গ্যাসের বাজারে এমন প্রকাশ্য লুণ্ঠন চললেও লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের নিরবতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের দাবি, প্রশাসন কেন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরু করছে না? কেন কোম্পানিগুলোর ভাউচার জালিয়াতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে না? এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে সরাসরি ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন ভোক্তারা।

সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, এটি কেবল দামের হেরফের নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ‘অর্থনৈতিক অপরাধ’। কোম্পানি থেকে খুচরা দোকান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।

সরকার দাম নির্ধারণ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, আর কোম্পানি ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষবে—এমন চিত্র কোনোভাবেই কাম্য নয়। লক্ষ্মীপুরের সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত চায় না, তারা চায় সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাসের নিশ্চয়তা। প্রশাসন কি পারবে এই ‘গ্যাস মাফিয়া’দের দৌরাত্ম্য থামিয়ে জনমনে স্বস্তি ফেরাতে?

Tag :
সর্বাধিক পঠিত

গণভোটের রায় অমান্যের প্রতিবাদে লক্ষ্মীপুরে ১১ দলের বিক্ষোভ

লক্ষ্মীপুরে গ্যাসের দামে ‘রক্তচোষা’ সিন্ডিকেট: লুটে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা

আপডেট: ০৪:৩২:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদন : লক্ষ্মীপুরে এলপিজি গ্যাসের বাজার এখন যেন এক ‘মগের মুল্লুক’। সরকার নির্ধারিত দাম ১৭২৮ টাকা হলেও, জেলাজুড়ে ভোক্তাদের থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৪০০ টাকা পর্যন্ত। বিইআরসি (এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন) প্রতি মাসে দাম নির্ধারণের নাটক করলেও লক্ষ্মীপুরে তার কোনো ছিটেফোঁটাও কার্যকর নেই। কোম্পানিগুলোর ভাউচার জালিয়াতি আর ডিলারদের অতি মুনাফার লোভে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের রান্নাঘরে এখন হাহাকার।

বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী কামরুল হাসান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “পত্রিকায় দেখি ১৭২৮ টাকা, দোকানে গেলে চায় ২৩০০ টাকা। দোকানিকে বললে সে ডিলারকে দোষ দেয়। আমরা কি চোর? নাকি আমাদের পকেট কাটার জন্য কোনো আইন নেই? প্রশাসন কি শুধু এসি রুমে বসে থাকার জন্য?”

শহরের এক গৃহিণী রাবেয়া খাতুন বলেন, “গ্যাসের দাম বাড়লে আমাদের চুলো বন্ধ হওয়ার জোগাড় হয়। ৬০০-৭০০ টাকা বাড়তি দেওয়া মানে আমার বাচ্চার দুধের টাকা কেটে নেওয়া। সরকার দাম ঠিক করে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে, কিন্তু বাজারে যে ডাকাতি হচ্ছে তা দেখার কেউ নেই।”

রিকশাচালক জয়নাল মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ৫০০ টাকা কামাই করি। অথচ একটা গ্যাসের সিলিন্ডারে ৭০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। এই দেশে গরিবের কোনো বিচার নাই, সব চোরের রাজত্ব!”

শীর্ষ সংবাদ এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নৈরাজ্যের মূলে রয়েছে বড় বড় কোম্পানির ‘অদৃশ্য’ হাত। বসুন্ধরা গ্যাসের মতো কোম্পানিগুলোর ডিপো থেকে ডিলারদের কাছে ১৭৪৩ টাকা রাখা হলেও কাগজে-কলমে ভাউচার দেওয়া হচ্ছে ১৬৩৩ টাকার। অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে ১১০ টাকার কোনো হদিস নেই! এই ‘ব্ল্যাক মানি’ বা গোপন লেনদেনের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ঘাড়ে।

ডিলাররা এই জালিয়াতির দায় স্বীকার করে বলছেন, “কোম্পানি আমাদের জিম্মি করে রেখেছে। তারা টাকা বেশি নিচ্ছে কিন্তু ভাউচার দিচ্ছে কম। এর ওপর ট্রান্সপোর্ট খরচ আর লেবার আছে। আমরা ২০০০ টাকার নিচে বিক্রি করলে আমাদের ফকির হতে হবে।”

এদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা বসুন্ধরা ও বেক্সিমকোর ডিলারদের কাছ থেকেই ২১০০ টাকা দরে গ্যাস কিনছেন। তাদের ভাষ্য— “আমরা যদি ২১০০ টাকায় কিনি, তবে ২৩০০-২৪০০ টাকায় বিক্রি না করলে আমাদের লাভ কই?” যদিও আজ ডিলাররা দাম কমানোর কথা বললেও খুচরা বাজারে এর কোনো প্রভাব নেই।

গ্যাসের বাজারে এমন প্রকাশ্য লুণ্ঠন চললেও লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের নিরবতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের দাবি, প্রশাসন কেন এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরু করছে না? কেন কোম্পানিগুলোর ভাউচার জালিয়াতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে না? এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নির্ধারিত দাম বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে সরাসরি ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখছেন ভোক্তারা।

সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, এটি কেবল দামের হেরফের নয়, এটি একটি পরিকল্পিত ‘অর্থনৈতিক অপরাধ’। কোম্পানি থেকে খুচরা দোকান পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে কঠোর মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা না করলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়।

সরকার দাম নির্ধারণ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, আর কোম্পানি ও ডিলাররা সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষবে—এমন চিত্র কোনোভাবেই কাম্য নয়। লক্ষ্মীপুরের সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত চায় না, তারা চায় সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাসের নিশ্চয়তা। প্রশাসন কি পারবে এই ‘গ্যাস মাফিয়া’দের দৌরাত্ম্য থামিয়ে জনমনে স্বস্তি ফেরাতে?