নিজস্ব প্রতিবেদন : খাতায়-কলমে চিকিৎসক আছেন, মাস শেষে বেতনও তুলছেন। কিন্তু কর্মস্থলে দেখা নেই তাঁদের। অধিকাংশ সময় শুধু হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই জেলা শহরে পাড়ি জমান তাঁরা। লক্ষ্মীপুর জেলার ৩৫টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চিত্র এখন এমনই। গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সরকারি এই মহৎ উদ্যোগ এখন একপ্রকার ‘শুভঙ্করের ফাঁক’-এ পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি আর জরাজীর্ণ অবকাঠামোয় লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, এসব কেন্দ্রের অনেক চিকিৎসকই কর্মস্থলে নিয়মিত থাকেন না। গত বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে রায়পুর উপজেলার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক লঙ্কাকাণ্ড। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার কেন্দ্রে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেই দ্রুত জেলা শহরে ফিরে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে শীর্ষ সংবাদকে জানান, “ডাক্তার সাহেব তো সপ্তাহে একদিন আসেন কি না সন্দেহ। আসলেও শুধু সই করেই চলে যান। আমরা এসে দেখি পিয়ন বা পরিদর্শিকা বসে আছেন। ওষুধ চাইলে জোটে শুধু প্যারাসিটামল।”
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুরের ৫টি উপজেলায় মোট ৩৫টি উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭টি, রায়পুরে ৭টি, রামগঞ্জে ২টি, কমলনগরে ২টি এবং রামগতিতে ৬টি কেন্দ্র অবস্থিত। ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডাক্তার না থাকায় অনেক কেন্দ্র এখন পরিত্যক্ত ভবনের মতো পড়ে আছে।
জেলায় অনুমোদিত ৬১৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে ১৬৫টি পদই শূন্য। এর মধ্যে সহকারী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট এবং পরিবার কল্যাণ সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে খালি। তবে স্থানীয়দের দাবি, যে কজন চিকিৎসক কর্মরত আছেন, তারা যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন, তবে ভোগান্তি অন্তত অর্ধেক কমত।
রায়পুর উপজেলার চরপাতা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সেবা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন শীর্ষ সংবাদকে জানান, “আগে ডাক্তার মাঝেমধ্যে আসতেন। এখন তো দেখাই মেলে না। এখানে এসে কোনো বিশেষজ্ঞ সেবা পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে আমাদের টাকা খরচ করে জেলা সদরে ছুটতে হয়।”
স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থাও শোচনীয়। বেশিরভাগ ভবন জরাজীর্ণ, পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোথাও কোথাও দরজা-জানালা চুরি হয়ে গেছে। ফলে সন্ধ্যা হলেই এসব কেন্দ্র মাদকসেবীদের আখড়ায় পরিণত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০১৯ সালে নামমাত্র কিছু সংস্কার কাজ হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের মাঝে শিশিরবিন্দুর মতো।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত চিকিৎসকরা দাবি করেছেন, তারা নিয়মিত কর্মস্থলে যান এবং দায়িত্ব পালন করেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা শীর্ষ সংবাদকে জানান, “গত এক বছরেও অনেক চিকিৎসককে নিয়মিত দেখা যায়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে শীর্ষ সংবাদকে জানান, “মেডিকেল অফিসারদের নিয়মিত কেন্দ্র পরিদর্শন ও সেবা দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জনবল সংকটের বিষয়টি আমরা জানি এবং দ্রুত নিয়োগের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
গ্রামাঞ্চলের এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে কেবল কাগজে-কলমে পদায়ন নয়, বরং কঠোর তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করেন সচেতন নাগরিক সমাজ। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার এবং দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে লক্ষ্মীপুরের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে।

















