০৭:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

অব্যবস্থাপনা নাকি পরিকল্পিত ধ্বংস? লক্ষ্মীপুরের মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে কোটি টাকার হরিলুটের মহোৎসব”

  • আপডেট: ০৯:২৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • 15

নিজস্ব প্রতিবেদন:আশির দশকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৫৪ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এক সময়কার সমৃদ্ধ এই হ্যাচারিটি এখন চরম অব্যবস্থাপনা, অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে। জনবল সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত কেন্দ্রটিতে ব্যাহত হচ্ছে মৎস্য রেণু ও পোনা উৎপাদন। এর মধ্যেই প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সংস্কার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে হ্যাচারির ভেতরে ২১টি পুকুর সংস্কার ও রাস্তার উন্নয়নের কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার নিম্নমানের কংকর ও সামগ্রী দিয়ে রাস্তার কাজ করছেন। তবে ঠিকাদার মো. জিয়ারুল হক ও হ্যাচারির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণু ও পোনা উৎপাদনের মূল মৌসুম। কিন্তু জনবল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চাষিদের চাহিদার ৩০ শতাংশও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ একটু নজর দিলেই এই হ্যাচারিটি দেশের মাছের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

১৯৭৯ সালে চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৫৪ একর জমির ওপর এই কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৮১ সালে এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে উন্নত মানের রেণু ও পোনার জন্য সারা দেশে এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু দুই দশক পার হতেই কেন্দ্রটিতে নানামুখী সংকট দেখা দেয়।

বর্তমানে ৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। অর্থাৎ ৬৩টি পদই শূন্য। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দুটি পদ, ছয়জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সবাই এবং একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদটি খালি পড়ে আছে। মৎস্য সম্প্রসারণ সুপারভাইজারের ৬টি পদ ও ল্যাবরেটরি সহকারীর ৬টি পদের সব কটিই শূন্য। এছাড়া ৮ জন ফিশারম্যানের সবাই এবং ৮ জন হ্যাচারি গার্ডের মধ্যে ৪ জন নেই। কর্মরতদের অনেকে আবার চলতি বছরেই অবসরে যাবেন। কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সাতটি আবাসিক ভবনের মধ্যে চারটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

অফিস সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারের অভাবে ৬৯টি পুকুরের মধ্যে ৩০টি পুকুর কয়েক বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী। পুকুরগুলোর পাড় ভেঙে গেছে, কোনোটি পরিণত হয়েছে খেলার মাঠে। লো-ভোল্টেজের কারণে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি তোলা যাচ্ছে না। পানির অভাবে চলতি বছর সাত-আট কেজি ওজনের প্রায় দুই শতাধিক মা মাছ (ব্রুড ফিশ) মারা গেছে। বাধ্য হয়ে পাশের ডাকাতিয়া নদীর দূষিত পানি ব্যবহার করায় অনেক সময় রেণুর গুণমান ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘বেসরকারি হ্যাচারির পোনা নিয়ে সংশয় থাকায় সবাই সরকারি হ্যাচারির ওপর নির্ভর করে। কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিলে এবং জনবল সংকট দূর করলে এই হ্যাচারির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’ তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।

রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের উপপরিচালক অজিত কুমার পাল বলেন, ‘শুরুতে এটি এশিয়ার বৃহত্তম হ্যাচারি থাকলেও এখন লোকবলসহ নানা সংকটে এটি জর্জরিত। ৮৪ জনের মধ্যে ৬৩ জনই নেই। বিরাজমান সংকটগুলো সমাধান করা গেলে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।’ সংস্কার কাজে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বড় কাজে ছোটখাটো কিছু সমস্যা হতে পারে, তবে ঠিকাদারকে মানসম্মত কাজ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

Tag :
সর্বাধিক পঠিত

লক্ষ্মীপুরে মার্কেটের জায়গা দখল করে মালামাল রাখাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীর উপর হামলা, প্রতিবাদে মানববন্ধন

অব্যবস্থাপনা নাকি পরিকল্পিত ধ্বংস? লক্ষ্মীপুরের মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রে কোটি টাকার হরিলুটের মহোৎসব”

আপডেট: ০৯:২৬:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদন:আশির দশকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ৫৪ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এক সময়কার সমৃদ্ধ এই হ্যাচারিটি এখন চরম অব্যবস্থাপনা, অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে। জনবল সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত কেন্দ্রটিতে ব্যাহত হচ্ছে মৎস্য রেণু ও পোনা উৎপাদন। এর মধ্যেই প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সংস্কার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মৎস্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে হ্যাচারির ভেতরে ২১টি পুকুর সংস্কার ও রাস্তার উন্নয়নের কাজ চলছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার নিম্নমানের কংকর ও সামগ্রী দিয়ে রাস্তার কাজ করছেন। তবে ঠিকাদার মো. জিয়ারুল হক ও হ্যাচারির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত রেণু ও পোনা উৎপাদনের মূল মৌসুম। কিন্তু জনবল ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চাষিদের চাহিদার ৩০ শতাংশও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অথচ একটু নজর দিলেই এই হ্যাচারিটি দেশের মাছের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

১৯৭৯ সালে চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় রুই জাতীয় মাছের উৎপাদন বাড়াতে ৫৪ একর জমির ওপর এই কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৮১ সালে এর কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হলে উন্নত মানের রেণু ও পোনার জন্য সারা দেশে এটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। কিন্তু দুই দশক পার হতেই কেন্দ্রটিতে নানামুখী সংকট দেখা দেয়।

বর্তমানে ৮৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। অর্থাৎ ৬৩টি পদই শূন্য। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দুটি পদ, ছয়জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার সবাই এবং একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদটি খালি পড়ে আছে। মৎস্য সম্প্রসারণ সুপারভাইজারের ৬টি পদ ও ল্যাবরেটরি সহকারীর ৬টি পদের সব কটিই শূন্য। এছাড়া ৮ জন ফিশারম্যানের সবাই এবং ৮ জন হ্যাচারি গার্ডের মধ্যে ৪ জন নেই। কর্মরতদের অনেকে আবার চলতি বছরেই অবসরে যাবেন। কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সাতটি আবাসিক ভবনের মধ্যে চারটি ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

অফিস সূত্রে জানা গেছে, সংস্কারের অভাবে ৬৯টি পুকুরের মধ্যে ৩০টি পুকুর কয়েক বছর ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী। পুকুরগুলোর পাড় ভেঙে গেছে, কোনোটি পরিণত হয়েছে খেলার মাঠে। লো-ভোল্টেজের কারণে গভীর নলকূপ দিয়ে পানি তোলা যাচ্ছে না। পানির অভাবে চলতি বছর সাত-আট কেজি ওজনের প্রায় দুই শতাধিক মা মাছ (ব্রুড ফিশ) মারা গেছে। বাধ্য হয়ে পাশের ডাকাতিয়া নদীর দূষিত পানি ব্যবহার করায় অনেক সময় রেণুর গুণমান ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘বেসরকারি হ্যাচারির পোনা নিয়ে সংশয় থাকায় সবাই সরকারি হ্যাচারির ওপর নির্ভর করে। কর্তৃপক্ষ একটু নজর দিলে এবং জনবল সংকট দূর করলে এই হ্যাচারির হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’ তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলার আশ্বাস দেন।

রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্রের উপপরিচালক অজিত কুমার পাল বলেন, ‘শুরুতে এটি এশিয়ার বৃহত্তম হ্যাচারি থাকলেও এখন লোকবলসহ নানা সংকটে এটি জর্জরিত। ৮৪ জনের মধ্যে ৬৩ জনই নেই। বিরাজমান সংকটগুলো সমাধান করা গেলে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হতো।’ সংস্কার কাজে অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বড় কাজে ছোটখাটো কিছু সমস্যা হতে পারে, তবে ঠিকাদারকে মানসম্মত কাজ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’