নিজস্ব প্রতিবেদন :লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বুক চিরে একসময় বয়ে চলত প্রমত্তা মেঘনা ও ডাকাতিয়া। বড় বড় মালবাহী ট্রলার আর পাল তোলা নৌকায় মুখর থাকত এ অঞ্চলের বাণিজ্য। অথচ আজ সেই চিত্র কেবলই স্মৃতি। দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে সংস্কার ও খনন না হওয়ায় নদী দুটি এখন এলাকাবাসীর জন্য ‘গলার ফাঁস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও প্রভাবশালীদের অবৈধ জবরদখল, কোথাও বা পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে নদী এখন মরণফাঁদ। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও লক্ষ্মীপুরবাসীর দীর্ঘশ্বাসের নাম এখন মেঘনা ও ডাকাতিয়া।
দখলদারের গ্রাসে নদী: দেখার কেউ নেই
সরেজমিনে রায়পুর উপজেলার ১০ নম্বর রায়পুর ইউনিয়নের চালতাতুলি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। সেখানে ডাকাতিয়া নদী দখল করে প্রকাশ্য দিবালোকে ইমারত নির্মাণ করছেন স্থানীয় দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি। শুধু ভবন নির্মাণই নয়, নদীর মাঝখানে আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মাছের খামার। এর ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। ১৩০ ফুট প্রস্থের নদীটি অনেক জায়গায় সংকুচিত হয়ে মাত্র ৫০-৬০ ফুটে এসে ঠেকেছে। দখলদারদের এমন দৌরাত্ম্যে নদীটি এখন সরু খালে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রায়পুর শহর, হায়দরগঞ্জ বাজার, বংশীব্রীজ ও হাজিমারা সুইচগেট সংলগ্ন এলাকাগুলোতেও দখলদারদের থাবা বিস্তৃত। কোথাও আবাসন প্রকল্প, কোথাও বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে গিলে খাওয়া হচ্ছে নদীর বুক।
সেচের জন্য হাহাকার: বিপাকে ২০ হাজার একর জমির কৃষক
নদীতে পানি না থাকায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে। বর্তমানে ইরি-বোরো ও রবি শস্যের মৌসুম চললেও মেঘনা ও ডাকাতিয়ায় পানির দেখা নেই। চৈত্র আসার আগেই নদীগুলো ধুধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। ফলে অচল হয়ে পড়ে আছে শত শত সেচযন্ত্র।
উপজেলা কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার একর আবাদি জমি নদী দুটির ওপর নির্ভরশীল। আগে যেখানে কৃষকরা দুই-তিনটি ফসল অনায়াসে ঘরে তুলতেন, এখন পানির অভাবে সেখানে এক ফসলের আবাদ করাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। রায়পুরের চরবংশী ও চরআবাবিল ইউনিয়নে মেঘনার প্রায় ৭৫ কিলোমিটার অংশ এখন পানিশূন্য। কৃষকদের দাবি, বর্ষার শেষ দিকেও নদীতে পর্যাপ্ত পানি থাকে না, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাণিজ্যিক ঐতিহ্যে ধস
এককালের প্রমত্তা ডাকাতিয়াকে কেন্দ্র করে রায়পুর ও হায়দরগঞ্জ হয়ে উঠেছিল দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও খুলনার সাথে নৌপথে পণ্য পরিবহনের প্রধান রুট ছিল এটি। নাব্যতা সংকটের কারণে এখন সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বিলীন। নদী হারিয়ে যাওয়ায় শত বছরের পুরনো নৌঘাটগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মসংস্থান হারিয়েছেন কয়েক হাজার জেলে ও মাঝি। অনেকে বাধ্য হয়ে পৈত্রিক পেশা ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন শহরে, বেছে নিয়েছেন শ্রমিকের জীবন।
৫৫ বছরের ফাইলবন্দী প্রকল্প
অভিযোগ রয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকারই মেঘনা ও ডাকাতিয়া খননের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মন্ত্রী-এমপিরা নদীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও বাস্তবে কোনো কাজ হয়নি। বিগত সরকার ডাকাতিয়া নদীর হায়দরগঞ্জ অংশে নামমাত্র কিছু সংস্কার কাজ করলেও তা ছিল অপরিকল্পিত ও প্রশ্নবিদ্ধ। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পানি সম্পদ উপদেষ্টা ও লক্ষ্মীপুরের কৃতি সন্তান শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী সারা দেশে নদী-খাল খননের ঘোষণা দিলেও রায়পুর অংশে এখনো কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি। এতে হতাশ এ অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ।
প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক চাপ
নদী দখল ও খননের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা অনেকটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, “স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক শক্তির চাপের কারণে অনেক সময় উচ্ছেদ অভিযান চালানো সম্ভব হয় না। আমরা চাকরির প্রয়োজনে এখানে আসি, কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও পরিবেশের স্বার্থে সব সময় কাজ করতে পারি না।”
তবে রায়পুর উপজেলা প্রশাসন সম্প্রতি পৌর শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে প্রশংসিত হলেও বড় বড় দখলদারদের উচ্ছেদে তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞ ও জনগণের দাবি
পরিবেশবাদীরা বলছেন, দ্রুত নদী খনন ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ না করলে এ অঞ্চলের ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হবে। এলাকাবাসীর দাবি—কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত আধুনিক খনন (ড্রেজিং), সুইসগেট কাম-রেগুলেটর নির্মাণ এবং নদী তীরবর্তী সীমান্ত চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে হবে।
রায়পুরবাসীর প্রশ্ন—যে নদী একসময় জীবন দিয়েছিল, সেই নদী আজ কেন অবহেলায় মরতে বসবে? ডাকাতিয়া ও মেঘনা কি তবে মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাবে? উত্তর খুঁজছে ভুক্তভোগী জনপদ।












